কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬ এ ১১:২৭ AM
কন্টেন্ট: পাতা
উপজেলা পর্যায়ে ২০২৫ সালে ৫টি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ৫ জন অদম্য নারী
মোসা: মোমেনা বেগম
মোসা: মোমেনা বেগম, জন্ম সদর উপজেলার চর বাররশিয়া গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে। নদী ভাঙ্গনে বাড়ীটি নদী গর্ভে বীলিন হয়ে যাওয়ায় বাবা বাধ্য হয়ে ছয় সন্তান নিয়ে নাচোল উপজেলার নাচোল ইউনিয়নের বেনিপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ভাই-বোনের মধ্যে মোছাঃ মোমেনা বেগম ছিলেন মেজ। তার কৃষি দিনমজুরি বাবাকে কাজ করে ০৮ জন সদস্যের সংসারের খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হতো। বিয়ের কাজ আসায় মোমেনাকে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে দেন। শশুর বাড়ির অবস্থাও ভালো ছিল না। এর মধ্যে তার স্বামী একটি কন্যা সন্তানসহ তাকে ডিভোর্স দেন। এমন এক পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে সহযোগিতার হাত বাড়ায় ব্র্যাক সংস্থা। স্বল্প পূঁজি দিয়ে মোমেনাকে তার নিজ বাড়িতে ছোট একটি মুরগীর খামার করে দেয়। মোমেনা অত্যান্ত যত্ন ও পরিশ্রমের সাথে মুরগী পালতে শুরু করেন। এরপর ডাসকো ফাউন্ডেশনের টেকসই প্রকল্পের সদস্য হিসেবে তাকে অন্তভূক্ত করে ১২ হাজার টাকা মূল্যে দুইটি ছাগল তুলে দেন। ছাগল ও মুরগীর খামার এই দুই ধরনের সম্পদ নিয়ে শুরু হয় তার পথ চলা। ছাগল ৭-৮ মাস পর বড় হলে বিক্রয় করে আবারও ছোট গুলো কিনে পালন করতেন ও বড় হলে বাজারে বিক্রয় করতেন। লাভের টাকায় মুরগীর খামার বড় করেছেন এবং গাভী কিনেছেন। এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে মোমেনা বেগমের মুরগির খামারে প্রায় ২৫০টি মুরগী আছে যার মূল্য এক লক্ষ টাকার অধিক, ১,২০,০০০ টাকা মূল্যের বড় একটি গাভী আছে, ৮টি ছাগল আছে যার মুল্য ৪০,০০০টাকা। ইচ্ছা শক্তি ও বাস্তবতা কে কাজে লাগিয়েও যে সাফল্য আনা যায় এই কথার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছেন মোমেনা বেগম।
মোসাঃ মরিয়ম খাতুন
মোসাঃ মরিয়ম খাতুনের বাবা সরকারি চাকরিতে থাকায় শিক্ষার পরিবেশ ছিল অনুকূল ও উৎসাহ ব্যঞ্জক। পড়ালেখার পাশাপাশি শৈশব থেকেই তার স্বপ্ন-দরিদ্র, মেধাবী ও সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষারদ্বার উন্মুক্ত করার। সে স্বপ্নকে বাস্তব করতে ও উচ্চ মানের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠাকরেন ‘এশিয়ান প্রিক্যাডেট স্কুল’। শিক্ষার্থীরা পরিক্ষায় অসাধারণ ফলাফল অর্জন করায় প্রতিষ্ঠানটির নাম ছড়িয়ে পড়ে এবং এস.এস.সি. ২০১১ সালে প্রথম বারেই সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ-৫ অর্জন করে নাচোল জুড়ে সৃষ্টি হয় আলোড়ন। প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ও স্থায়িত্বের লক্ষ্যে ২০১১ সালে নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তুলেন এবং নামকরণ করেন ‘এশিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ’। নিজেও অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত তার এ ব্যক্তি মালিকানাধীন স্কুলটি প্লে গ্রুপ হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানে ২১৭৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। সু-সজ্জিত লাইব্রেরী, সমৃদ্ধ ল্যাব, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব শিক্ষার্থীদের মেধা এবং মানসিক বিকাশ সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এছাড়া চিত্ত-বিনোদনের জন্য রয়েছে সুবিশাল খেলার মাঠ। প্রতিষ্ঠানটি অভাবনীয় সাফল্য অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে শিক্ষার ও সমাজের উন্নয়নে ঘটছে পাশাপাশি প্রায় শতাধিক শিক্ষক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে এবং অত্র অঞ্চলের মানুষ আয়ের উৎস খুঁজে পাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং বেকারত্ব দূরীভূত হচ্ছে। এছাড়া ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে না, এলাকার মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সুন্দর সমাজ গঠনে শিক্ষার বিকল্প নেই। বিধায় ধনী-গরিব সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ভুমিকা রাখছেন তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান।অনুপ্রানিত করছেন শত শত তরুণ মেধাবীদের। তার এটি শুধু একটি স্বপ্নের উদ্যোগ নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের পথে একটি ছোট অথচ দৃঢ় পদক্ষেপ।
মোসা: ফরিদা ইয়াসমিন
মোসা: ফরিদা ইয়াসমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলায় ক্ষুদ্র এক ব্যবসায়ীর ঘরে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবার পক্ষে সীমিত আয় দিয়ে ৫ সন্তানের সংসার চালানোই ছিল কঠিন। তার উপর সবার পড়ার খরচ জোগানোটা ছিল রীতিমতো সংগ্রাম। এ সংগ্রাম করে ১৯৯৩ সালে নাচোল (২) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনীতে উত্তীর্ণ হয়ে নাচোল খ. ম.উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৯৯ সালে এস.এস.সি- তে প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এরপর নাচোল মহিলা কলেজ থেকে ২০০৪ সালে এইচ.এস.সি পাশ করেন। ২০০৮ সালে বি.এস.এস এবং ২০১২ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এম. এস. এস. সম্পন্ন করেন। চাকুরী জীবনে ২০০৮ সালে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজ করেন ও ২০০৯ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তার লক্ষ্য ছিল একজন ভালো শিক্ষক হওয়া। করোনা কালীন সময়ে অনলাইন ক্লাস পরিচালনা, কনটেন্ট তৈরি এবং শিক্ষক বার্তায়নে আপলোড করে সমস্ত পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে প্রায় সাত লক্ষ শিক্ষকের সেরা অনলাইন পারফরমার(২০২০) গৌরব অর্জন করেন। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় রাজশাহী বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (২০২৩) নির্বাচিত হন ও জাতীয় পর্যায়ে অংশ গ্রহণের সুযোগ পান। জেলা অ্যাম্বাসেডর (২০১৯) নির্বাচিত হন। প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (২০২২) সম্মাননা অর্জন করেন এবং উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষক (২০২১) নির্বাচিত হন। গুণি শিক্ষক (২০২৫) নির্বাচিত হওয়ার সম্মানও অর্জন করেন। চাকুরি ক্ষেত্রে অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের এই সফলতা গুলো তিনি অর্জন করেন। সকল প্রতিকূলতা এবং ঘাত-প্রতি ঘাতের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে একজন সফল এবং আত্মবিশ্বাসী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মোসা: জোৎস্না আরা খাতুন
দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে বাল্যবিয়ে শিকার মোসা: জোৎস্না আরা খাতুন স্বামীর ঘর থেকেই ১৯৭৫ সম্পন্ন করেন স্কুল জীবন এবং ১৯৭৮ - ২০১৭ সাল স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা পদে কাজ করেন। অত্র অঞ্চলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভাল না থাকায় রাতের ঘুম ও বিশ্রাম বিঘ্নিত করে বাড়ী বাড়ী গিয়ে দুই হাজারেরও বেশী নরমাল ডেলিভারী সম্পন্ন করান ও পরিকল্পিত পরিবার গঠনে হাজার হাজার নারী ও পুরুষকে পরামর্শ প্রদান করেন। তার এই একনিষ্ঠ কাজের জন্য জেলা ও উপজেলার শ্রেষ্ঠ পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার দুই ছেলের বড়টি তৌহিদুল ইসলাম (শাহীন) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের "ভুগোল ও পরিবেশ বিদ্যা" বিভাগে হতে বি.এস.সি ও এম,এস.সি সম্পন্ন করে তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রী কলেজ, তানোর, রাজশাহীতে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন এবং ছোট ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান (তুহিন), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগ হতে বি.এ (সম্মান) ও এম.এ সম্পন্ন করে বাংলাদেশ টেলিভিশনে চিত্র গ্রাহক হিসাবে কর্মরত আছেন। অন্যদিকে বড় পুত্র বধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা ও ছোট পুত্র বধু এশিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ নাচোল সাথে সম্পৃক্ত। চাকুরী থেকে অবসর গ্রহনের পর তিনি বাড়ীর আঙিনায় ফুল ও ফলের বাগান করেন। দেশী ছাগল-মুরগি, কবুতর পালন করেন। এ সফল জননীর এখন একটাই ইচ্ছে- জীবনের শেষটা পর্যন্ত যতটুকু সম্ভব সমাজ থেকে দারিদ্রতা, কুসংস্কার, কুশিক্ষা দুর করা।
শ্রী মতি মাধবী রানী
শ্রী মতি মাধবী রানী গ্রামের দিনমজুর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পান। ২০০১ সালের ২৪ আগষ্ট মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয় দীলিপ কর্মকার এর সাথে। মাধবী রানীর দুচোখ ভরা স্বপ্ননিয়ে স্বামীর সংসারে আসেন। কিন্তু তার স্বামী ছিলেন অশিক্ষিত, বেকার এবং মাদকাসক্ত। স্বামীর ঘর-বাড়ী কিছুই ছিলনা। অভাবের সংসারে মানষিক নির্যাতন করতেন। এমন কোনদিন নেয় যে তার পিঠে লাঠির আঘাত পরেনি, এমনকি লোহা ও আগুনের আক্রমনেরও শিকার হন। এর ফলে কোন কোন সময় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। দেখতে দেখতে তাদের দুইটিকন্যা ও একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তিনি মানুষের বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে কাজ করতেন। এই কাজকরে যে টাকা উপার্জন করতেন সেই টাকা দিয়ে তিনি তার সংসার চালাতেন এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে একটি সেলাই মেশিন পেয়ে তিনি সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার কাজ বাড়তে লাগলে, কিছুবছর পর সে অল্প কিছু টাকা জমা করে একটি ছোট কাপড়ের ব্যবসা শুরুকরেন। ছেরে-মেয়েদের লেখাপড়া করান এবং বড় মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। জীবনের নির্যাতনের বিভীষিকাময় অধ্যায়কে মুছে ফেলে সচ্ছলতার সহিত ভালো আছেন। তার এখন একটাই স্বপ্ন ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া শেষে সমাজের কাছে প্রতিষ্ঠিত করে তোলা।